তর্পণ যে কেউ করতে পারে, কাউকে নিয়ে করা যেতে পারে, নিজের জন্যও করা যায়। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে, পূর্বপুরুষ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব — জীবিত কিংবা মৃত, সকলের জন্যই করা যায়। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্নভাবে করা গেলেও, ভাব একটাই থাকে — কোনো রকম দেওয়া–নেওয়ার চিন্তা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে করা।

হিন্দু শাস্ত্রে প্রচলিত —

বাড়িতে প্রতিদিন দুপুর ১২টার দিকে রান্নাঘরে মা অন্নপূর্ণা আসেন; পূজার ঘরে প্রতিষ্ঠিত দেব-দেবীরা থাকেন; আর দুপুর ১২টার পর আসেন পূর্বপুরুষেরা। তাই রান্না, স্নান ও পূজা ১২টার মধ্যে করা, এবং পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দেওয়া—এসব বিধান প্রচলিত।

আমাদের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন ১২টার মধ্যে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই পিতৃপক্ষের বিশেষ দিনগুলোতে অনেকে পূর্বপুরুষকে জল দেন। যদিও তখনও সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না, তবুও মহালয়ার এই বিশেষ দিনে অনেকেই সেই আচার পালন করেন।

আসলে, সেই মহাকালে এমন এক শক্তি সক্রিয় থাকে, যা বিশেষভাবে মর্যাদা লাভ করেছে।

তর্পণ করার নিয়ম

  • পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দিতে দক্ষিণমুখী হয়ে বসতে হয়। দক্ষিণ দিক হলো শক্তির প্রতীক, অগ্নির প্রতীক। ডান দিকের হাঁটু যেন মাটিতে না পড়ে, বা-দিকের হাঁটু মাটিতে স্পর্শ থাকবে।
  • আপনি পোইতে পড়ে থাকলে, ওটি শরীর থেকে না বার করে, ডান কাঁধের উপরে রেখে পড়ুন। তর্পণ কর্যের পর পোইতে মনে করে আবার সোজা করে নেবেন।
  • দক্ষিণমুখে বসুন। আসনের উপর বসতে পারেন, অথবা আসন ছাড়া মাটির উপরও বসতে পারেন। যেটি সম্ভব হয়, সেটিই করুন।
  • দক্ষিণমুখে একটি প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালান।
  • আপনার সামনে একটি পাত্র নিন (আপনার সুবিধামতো)।
  • একটি ঘটে জল নিন (গঙ্গাজল অথবা পরিষ্কার জল)।
  • একটি পাত্রে কালো তিল নিন।

প্রক্রিয়া

  • ঘটের মধ্যে সমস্ত শক্তিকে আহ্বান করুন, যাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে চান তাদের শক্তিকে আমন্ত্রণ জানান। ভাব রাখুন—তিনি বা তাঁরা সেই ঘটের ভেতরে যে গঙ্গাজল/জল আছে, তার মাধ্যমে উপস্থিত হয়েছেন।
  • ঘটের মধ্যে একটু কালো তিল দিন।
  • তারপর যাদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে চান, তাঁদের জন্য পিতৃতীর্থ (তর্জনী এবং বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখান) দিয়ে তিনবার করে জল ঢালুন।

মন্ত্র

বিষ্ণুঃ ওম্ (অমুক)-গোত্র* (সম্পর্ক) (সম্পর্কের নাম) দেবশর্মা* / দেবী ত্রিপ্যস্বৈতওে সতিল-গঙ্গোদকং* তস্মৈ স্বধাঃ নমঃ। তস্মৈ স্বধাঃ নমঃ। তস্মৈ স্বধাঃ নমঃ।

ভাবনা রাখবেন:
(সম্পর্ক), তোমাকে আহ্বান করি, প্রণাম করি; তর্পণ গ্রহণ করো। (সম্পর্ক), তোমার সকল দায়িত্ব সম্পূর্ণ ও সফল।

ক্ষমা মন্ত্র

ওঁ আবাহনং ন জানামি ন জানামি বিসর্জনম্ ।
পূজাঞ্চৈব ন জানামি ত্বং গতি পরমেশ্বরি॥ 

মানে
আমি আবাহনও জানি না, আমি পূজার সঠিক নিয়মও জানি না আমি বিসর্জনও জানি না তাই হে পরমেশ্বর, তুমি আমাকে ক্ষমা করো।

উল্লেখ

  • পুরুষের উদ্দেশ্যে “গোত্র”, মহিলাদের উদ্দেশ্যে “গোত্রে”।
  • দেবশর্মা – তিনি যদি পুরুষ হন।
  • দেবশর্ম্মন্ – তিনি যদি পুরুষ ব্রাহ্মণ হন।
  • দেবী – তিনি যদি মহিলা হন।
  • গঙ্গোদকং – গঙ্গাজলে তর্পণ করলে।
  • সতিলোদকং – সাধারণ পরিষ্কার জলে তর্পণ করলে।